কক্সবাজারে শারদীয় দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদ্যাপন নিশ্চিত করতে জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ও প্রতিমা নির্মাণ কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ও পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান।
সোমবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মণ্ডপ পরিদর্শনকালে তারা পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং উৎসব সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এ বছর কক্সবাজার জেলায় ৩২৪টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৪টি প্রতিমাপূজার মণ্ডপ এবং ১৭০টি ঘটপূজার মণ্ডপ। গত বছরের তুলনায় এবার জেলায় পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ছয়টি। উৎসবকে ঘিরে মণ্ডপগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। পাশাপাশি নিরাপত্তা, দর্শনার্থীদের চলাচল ও সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো।
মণ্ডপ পরিদর্শনের সময় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার নিরাপত্তা-ব্যবস্থা, আলোকসজ্জা, স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন। তারা পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সমস্যা, প্রয়োজন ও পরামর্শ শোনেন। উৎসব চলাকালে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, কক্সবাজারে সব ধর্মের মানুষ যুগ যুগ ধরে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছেন। এ ঐতিহ্য অটুট রাখতে প্রশাসনের সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যাতে নির্বিঘ্নে, আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদ্যাপন করতে পারেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এ সময় তিনি সবাইকে কোনো ধরনের গুজব বা উসকানিতে কান না দিয়ে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান।
জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পূজা চলাকালে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে থাকবে। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্নে যাতায়াত এবং কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ, কক্সবাজার জেলা শাখার তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ উৎসব। উৎসবকে কেন্দ্র করে জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণ, সাজসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতির কাজ এগিয়ে চলছে।
জেলায় এবার সবচেয়ে বেশি পূজামণ্ডপ রয়েছে চকরিয়া উপজেলায়। সেখানে ৭১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া কুতুবদিয়ায় ৪৪টি, রামুতে ৩৭টি, কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৩১টি, ঈদগাঁওয়ে ২৯টি, মহেশখালীতে ২৮টি, কক্সবাজার পৌরসভায় ২৬টি এবং চকরিয়া পৌরসভায় ২৫টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। পেকুয়া ও উখিয়ায় নয়টি করে এবং মহেশখালী পৌরসভা ও টেকনাফে ছয়টি করে মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে।
পূজা উদ্যাপন পরিষদ, কক্সবাজার সদর উপজেলা শাখার সভাপতি আইনজীবী বাপ্পি শর্মা বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসব সুষ্ঠু, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান যথাযথভাবে পালনের পাশাপাশি উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো কাজ করছে।
জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের অর্থ সম্পাদক স্বপন গুহ বলেন, দুর্গাপূজার ছুটি বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। এবার পূজার ছুটির সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে পেশাজীবীরা পাঁচ দিনের ছুটি পাচ্ছেন। পাশাপাশি মণ্ডপ প্রতি সরকারি অনুদানও বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি। পূজা শেষ হওয়া পর্যন্ত সরকারের আন্তরিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন এই নেতা।
জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু বলেন, জেলার ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্নে যাতায়াত এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে এবারের দুর্গোৎসব সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের মিলনমেলায় পরিণত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি ও কক্সবাজারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দোলন ধর জানান, দুর্গোৎসব সফল করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পূজামণ্ডপ কমিটির নেতাদের সঙ্গে একাধিক সভা হয়েছে। সবার সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে এবারের উৎসব আনন্দমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হবে বলে আশা করছেন তারা।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের ফোকাল পয়েন্ট অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মো. অহিদুর রহমান বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিতে জেলা পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন শাখার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া ট্রাফিক পুলিশ ও টুরিস্ট পুলিশও দায়িত্বে থাকবে। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তার পাশাপাশি কক্সবাজারে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দুর্গোৎসবের শেষ পর্বে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে লাবণী পয়েন্টে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে সম্প্রীতির মিলনমেলা বসবে। এ আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতাদের ভাষ্য, বিভিন্ন গোয়েন্দা ও বিশেষায়িত সংস্থার সদস্যরাও বিসর্জন অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে মাঠপর্যায়ে কাজ করবেন।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পূজা উদ্যাপন কমিটি ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় কক্সবাজারে এবারের দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হবে।