কলকাতার নিউ মার্কেটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহতরা আগুনে পুড়ে নয়, মূলত বিষাক্ত ধোঁয়া ও গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন বলে মন্তব্য করেছেন পার্ক স্ট্রিট থানার এক সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, নিহতরা আগুনে পুড়ে নয়, সিস্টেমের কারণেই মারা গেছে। তার দাবি, হোটেলটির অপর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে ধোঁয়া বের হতে পারেনি। ফলে ভেতরে আটকে পড়া মানুষ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সন্ধ্যায় কলকাতার নিউ মার্কেটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পুলিশ ও ব্যবসায়ী সমিতির মধ্যে বৈঠক হয় ‘যমুনা ব্যাংকোয়েটস’-এ। সেখানেই হোটেল ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে এসব কথা বলেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।
১৫/এ মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলের অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আমি সেদিন ওই হোটেলে ঢুকে দেখেছি, সেখানে আসলে কিছুই নেই। আমার খুব কষ্ট হয়েছে। আমার মনে হয়েছে, এটি একটি বড় হলরুম
ছিল। সেই হলরুমকে পাটিশন করে মাঝখানে সরু একটি গলি তৈরি করা হয়েছে। দুই পাশে পার্টিশন দিয়ে ছোট ছোট কক্ষ ও বাথরুম তৈরি করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘একটাই দরজা থাকায় ভেতরে ধোঁয়া সহজে বের হতে পারেনি। কিন্তু ভেতরে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা থাকলে এই সমস্যা
এদিন ‘শিখা ইন’ হোটেলের অগ্নিকাণ্ডের পর পুলিশ ও ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে বৈঠক করেন পার্ক স্ট্রিট থানার কর্মকর্তারা। বৈঠকে হোটেল ব্যবসায়ীদের জন্য একাধিক নির্দেশনা দেয়া হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদেরও কষ্ট হয়েছে। আমরা রাত তিনটা থেকে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। যদি প্রাণগুলো বাঁচাতে পারতাম, তাহলে আমরা অনেক খুশি হতাম। ৯টি প্রাণ চলে যাওয়া ছোট কোনও ঘটনা নয়। এটি জাতীয় সংবাদ হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদও হয়েছে।
আমাদের এখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে।’
তিনি বলেন, প্রতিটি হোটেলে ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স এবং ডিজি অফিস থেকে দেয়া পুলিশ লাইসেন্স থাকতে হবে। রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে ফুড লাইসেন্সও বাধ্যতামূলক। নিজেদের খরচে নিয়মিত ফায়ার অডিট করাতে হবে।
এ ছাড়া রাতে হোটেলে একজন কর্মী বা নিরাপত্তাকর্মীকে দায়িত্বে রাখতে হবে, যিনি জেগে থাকবেন। রাতেও হোটেলের মূল গেট পুরোপুরি বন্ধ রাখা যাবে না। অতিথিদের জন্য হতো না। ওই কক্ষটিতে বের হওয়ার পথ ছাড়া একটি জানালাও ছিল না।’
হোটেলটির কক্ষ বিন্যাস নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘একটি ছোট জায়গায় ম্যানেজারের ডেস্ক ছিল। এরপর পার্টিশন করে দুই পাশে ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল। যারা মারা গেলেন, তারা মূলত এই ব্যবস্থার কারণেই মারা গেছেন। আগুনে পুড়ে নয়, গ্যাসের সঙ্গে কার্বন ভেতরে ঢুকে তারা মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে একটি ছোট শিশুও ছিল।’
হোটেল ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অনেক মানুষ এই শহরে এসে আপনাদের ওপর ভরসা করে থাকেন। এই শহরে তাদের কেউ নেই। যারা ১ হাজার বা ১ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে হোটেলের কক্ষ নেন, তারা বিত্তশালী মানুষ নন। এক দেশ থেকে অন্য দেশে এসে তারা আপনাদের ওপর ভরসা করেন। তাদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের।’
অন্তত বাথরুমে একটি ভালো এক্সজস্ট ফ্যান থাকলেও কিছুটা ধোঁয়া বাইরে বের হতে পারত। আপনারা নিজেদের হোটেলের বাথরুমগুলো দেখুন। বাথরুমের জানালা কতটা বড়, সেটিও দেখুন।’
অগ্নিকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পরও হোটেলের ভেতরে গ্যাস জমে ছিল বলে দাবি করেন তিনি। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘রাত দুইটার দিকে আগুন লাগে। সিনিয়র কর্মকর্তাদের নির্দেশে আমি সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে হোটেলের ভেতরে ঢুকি। তার আগে দমকলকর্মীরা ভেতরের ধোঁয়া বের করে দিয়েছিলেন। তারপরও ভেতরে গ্যাস ছিল।’
তিনি বলেন, ‘যেহেতু এটি একটি বড় হলরুম ছিল, তাই বের হওয়ার জন্য একটি মাত্র পথ ছিল। পাশে চারটি কক্ষ তৈরি করা হলেও কোথাও কোনও ভেন্টিলেটর ছিল না। ঘরে আগুন লাগার পর ধোঁয়া বের হওয়ার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। ভেতরের সাজসজ্জা করা হলেও ধোঁয়া বের হওয়ার পথ রাখা হয়নি।’
ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এসি চালু থাকা অবস্থায় আগুন লাগলে এসির মাধ্যমে ধোঁয়া বা গ্যাস বাইরে বের হতে পারছিল না অন্তত বাথরুমে একটি ভালো এক্সজস্ট ফ্যান থাকলেও কিছুটা ধোঁয়া বাইরে বের হতে পারত। গেস্ট রেজিস্টার রাখা বাধ্যতামূলক। প্রতিদিনের অতিথিদের তথ্য ফর্ম বি ও ফর্ম সি-এর মাধ্যমে অনলাইনে জমা দিতে হবে।
নির্দিষ্ট নথি ছাড়া কোনও অতিথিকে হোটেলে রাখা যাবে না। জরুরি বের হওয়ার পথ বা এমার্জেন্সি এক্সিটের সামনে ছোট জায়গাতেও গাড়ি পার্ক করা যাবে না। সব হোটেলে ফায়ার অ্যালার্ম ও প্যানিক অ্যালার্ম রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
প্রতিটি হোটেলে একটি এমার্জেন্সি এক্সিট তৈরির উদ্যোগ নেয়ার কথাও বলা হয়েছে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে প্রকৌশলীদের সঙ্গে পরামর্শ করার পরামর্শ দিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
ব্যবসায়ী সমিতির ওই বৈঠকে পার্ক স্ট্রিট থানার ওসি অমিত চট্টোপাধ্যায়, সিনিয়র কর্মকর্তা মহসিন কামালসহ একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।