
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে দুর্গাপূজা আয়োজনে ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব অর্থই আসবে বিজ্ঞাপন ও অনুদান থেকে। গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে এসব তথ্য জানিয়েছে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে দুর্গাপূজার আয়োজন করে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি ও বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ। আয়োজকেরা জানান, এবার তাঁদের প্রতিপাদ্য ‘পরিবেশবান্ধব দুর্গাপূজা’।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুকুমার পাল দীর্ঘদিন ধরে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনের প্রতিমা তৈরি করে থাকেন। এবারও তিনি প্রতিমা তৈরি করছেন। দেড় মাস আগে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এখন চলছে শেষ পর্যায়ের কাজ। ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচে এই প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে।
মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকেশ্বরীর মেলাঙ্গনে দুর্গাপূজার জন্য তাঁরা বাজেট করেছেন ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা। প্রতিমা তৈরি, সাজসজ্জা, ছয় দিন প্রসাদ বিতরণসহ নানা কাজে এসব অর্থ ব্যয় হবে। সব টাকাই আসছে বিজ্ঞাপন ও অনুদান থেকে।
মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ প্রথম আলোকে বলেন, এবারের দুর্গাপূজায় ঢাকেশ্বরীতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসবেন। অষ্টমীতে প্রসাদ বিতরণের উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার। এবার প্রসাদ বিতরণ বেশি হবে, তাই বাজেট বেশি। আগের মতো এবারও প্রতিমা ও সাজসজ্জা থাকছে।
আয়োজকেরা জানান, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে দুর্গাপূজার জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ১০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান এই পূজার জন্য দিয়েছেন ৫ লাখ টাকা।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের মেলাঙ্গণে মণ্ডপের পাশেই তৈরি হচ্ছে দুর্গাপূজার প্রতিমা। প্রতিমা তৈরির স্থানে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার নেই। আয়োজকেরা গতকাল মঙ্গলবার জানান, প্রতিমা তৈরি হয়ে গেছে। তবে প্রতিমায় চূড়ান্ত রঙের (ফিনিশিং) কাজ শুরু হয়নি। আগামীকাল বৃহস্পতিবারের মধ্যে প্রতিমা প্রস্তুতসহ সব ধরনের কাজ শেষ হবে। শুক্রবার (দুর্গাষষ্ঠীতে) সকালে সবার জন্য প্রতিমা উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের ফটক রঙিন করা হয়েছে। ফটকে লেখা ‘শারদীয় শুভেচ্ছা’। মন্দিরের দেয়ালে লাগানো হয়েছে দেবী দুর্গার পোস্টার।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের মেলাঙ্গনে দুর্গাপূজা মণ্ডপের সামনে মাটি খুঁড়ছিলেন শাহ আলী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভক্তরা পূজা দেখতে আসার সময় যেন শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে, সে জন্য বাঁশ দিয়ে বাউন্ডারি (বেড়া) তৈরি করা হচ্ছে। এ কাজে মাটি খোঁড়া হচ্ছে। মাটিতে বাঁশের খুঁটি পোতা হবে। সেসব খুঁটিতে বাঁশ বেঁধে বাউন্ডারি তৈরি করা হবে।
শাহ আলী বলেন, তাঁরা ছয়জন সাত–আট দিন ধরে মঞ্চ তৈরি, প্যান্ডেল স্থাপন ও বেড়া দেওয়ার কাজ করছেন। পূজা শুরুর আগেই তাঁরা সব কাজ শেষ করতে পারবেন বলে তাঁর আশা।
মণ্ডপের কাজও প্রায় শেষ। দেখা যায়, মণ্ডপের অংশ রং করা হয়েছে। কৈলাস পর্বতের ছবি–সংবলিত একটি পোস্টার লাগানো হয়েছে মণ্ডপে। দুর্গাপূজার প্রতিমা স্থাপনের পর কৈলাস পর্বতের ছবি থাকবে তার পেছনে।
মণ্ডপে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করছিলেন হাবিবুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক দিন ধরেই তাঁরা ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করছেন। আশা করছেন তাঁদের কাজ দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে।
একটি কোম্পানির বিজ্ঞাপন বসানোর কাজ করছিলেন মো. হামিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, পিলার করে তাঁরা এসব বিজ্ঞাপন বসাচ্ছেন। আরও তিন দিনের মতো লাগতে পারে এসব বিজ্ঞাপন বসাতে।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সব সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা থাকে। দুর্গাপূজা উপলক্ষে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। আয়োজকেরা জানান, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে এবার ৬৪টি সিসি ক্যামেরা বসাচ্ছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষও থাকবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা পাচ্ছেন বলে জানান মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে তাঁরা নিরাপত্তার কোনো অভাববোধ করছেন না।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর প্রথম আলোকে বলেন, এবার সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মন্দির ও মণ্ডপে দুর্গাপূজা হবে। গত বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপ ও মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজা হয়েছিল। সে হিসাবে এবার দেশে বেশি দুর্গাপূজা হচ্ছে।
মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি প্রথম আলোকে জানিয়েছে, এবার ঢাকা মহানগরে দুর্গাপূজা হবে ২৫৭টি মন্দির ও মণ্ডপে।
জাতীয় মন্দিরে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি গত বছর জানিয়েছিল, ২০২৫ সালে ঢাকা মহানগরের ২৫৯টি মন্দির ও মণ্ডপে দুর্গাপূজা হয়েছে।
গত বছরের তুলনায় এবার দুটি দুর্গাপূজা কম হচ্ছে ঢাকা মহানগরে। এ বিষয়ে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি বলছে, গত বছর কাউন্দিয়া ইউনিয়নের দুর্গাপূজা গণনা করা হয়েছিল। এবার কাউন্দিয়া ইউনিয়নের দুর্গাপূজা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কারণ, এটি সাভারে পড়েছে।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে এবার ২০ থেকে ২২ অক্টোবর সরকারি ছুটি। ২৩ ও ২৪ অক্টোবর যথাক্রমে শুক্র ও শনিবার। হিন্দু সম্প্রদায় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সব মিলিয়ে পাঁচ দিন সরকারি ছুটি পাচ্ছে।
দুর্গাপূজার জন্য হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে চার কোটি টাকা অনুদান চেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ বিবেচনায় পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন।
এ ছাড়া দুর্গাপূজায় ঘরমুখী যাত্রীদের সুবিধাজনক ও নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে তিন জোড়া বিশেষ ট্রেন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে। পাশাপাশি যাত্রীর চাপ সামলাতে পাঁচটি ট্রেনের ডে–অফও (বন্ধের দিন) প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এবার ইতিমধ্যে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেছে ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে। ১৬ অক্টোবর দুর্গাষষ্ঠী। মহাসপ্তমী ১৭ ও ১৮ অক্টোবর, মহাঅষ্টমী ১৯ অক্টোবর, মহানবমী ২০ অক্টোবর এবং বিজয়া দশমী ২১ অক্টোবর।